প্রশ্ন :ভারতে প্রবর্তিত বিভিন্ন প্রকার ভূমি রাজস্বের পরিচয় দাও ?
ভূমিকা: 1765 খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি দেশীয় শাসনব্যবস্থা ও রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে কোম্পানির একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে অত্যাধিক রাজস্ব আদায় করা। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে 1717 খ্রিস্টাব্দে বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর দেখা দেয়। ওয়ারেন হেস্টিংস 1772 খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল হিসেবে বাংলায় দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটান এবং ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে রাজস্ব আদায়ের কোম্পানির হাতে তুলে দেন।
কোম্পানির আমলে ভারতের বিভিন্ন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা:
কোম্পানির আমলে প্রবর্তিত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা গুলি হল -
১. পাঁচশালা বা ইজারাদারি ভূমি ব্যবস্থা:
রাজস্ব আদায়ের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংস গভর্নর ও তার কাউন্সিলের চারজন সদস্য কে নিয়ে 1772 খ্রিস্টাব্দে একটি ভ্রম্যমান কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির সুপারিশে যে জমিদার কোম্পানিকে সর্বোচ্চ রাজস্ব দিতে রাজি হয় তাকে পাঁচ বছরের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, এই ব্যবস্থা পাঁচশালা বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। তিনি পূর্ব তর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজারদের নতুন নামকরণ করেন কালেক্টর। 1773 খ্রিস্টাব্দে রাজস্ব বোর্ড গঠন করেন।
২. একসালা ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা
পাঁচশালা বন্দোবস্তের বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়লে 1776 খ্রিস্টাব্দে গঠিত আমিনী কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে 1777 খ্রিস্টাব্দে তিনি এক বছরের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত চালু করেন যা একসালা ভূমি ব্যবস্থা নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় ---
- প্রতিবছর পুরনো জমিদারদের ওই জমি বন্দোবস্ত দেয়া হতো।
- বিগত তিন বছরের রাজস্বের গড়ে রাজস্ব নির্ধারিত হত।
- জমিদারের রাজস্ব বাকি থাকলে জমিদারির অংশ বিক্রি করে রাজস্ব পরিশোধের ব্যবস্থা ছিল। তবে এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার বেশি হওয়ায় কৃষক শোষণ বৃদ্ধি পায়। জমিদাররা তাদের সব রাজস্ব আদায় করতে পারতেন না।
- জমিদাররা নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে সরকারকে দেওয়া অর্থ সরকারকে জমা দিলে তারা জমি ভোগ দখল বন্ধক দান এমনকি তারা জমি বিক্রি করতে পারবেন।
- ভূমির রাজস্বের পরিমাণ 1793 খ্রিস্টাব্দের হারে বহাল থাকবে।
- ভূমির রাজস্বের 89% সরকার এবং 11% জমিদার পাবে।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগেও খাজনা মকুব হবে না।
তবে এই ব্যবস্থায় কিছু সুফল ও কুফল দেখা যায়। হোমসে ব্যবস্থা কে একটি দুঃখজনক ভুল বলেছেন।
পার্সি ভাল স্পেয়ার এর মতে এই ব্যবস্থায় কৃষকরা জমিদারদের ভাড়াটে মজুরের পরিণত হয়
জমির উন্নত ব্যাহত হয়
সরকারের লোকসান হয়।মার্শম্যানের মতে এটি ছিল একটি সাহসিকতা এবং বিচক্ষণ পদক্ষেপ। কারণ
A. আয় সুনির্দিষ্ট হওয়াই বাজেট তৈরিতে সুবিধা হয়।
B. কৃষক উৎখাতের আশঙ্কা কমে।
৫. রায়তওয়ারি ব্যবস্থা : ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার রীড ও টমাস মনরো উদ্যোগে মুম্বাই মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কিছু কিছু অঞ্চল দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত চালু হয়।
এই ব্যবস্থায়--কোন মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না।
জমির উৎপাদনের ভিত্তিতে জমিকে ৯ টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়।
কৃষকদের কোন মালিকানার ব্যবস্থা ছিল না।
৬. মহলওয়ারি ব্যবস্থা
1822 খ্রিস্টাব্দে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ গাঙ্গেয় উপত্যকা ও মধ্য ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে মহলওয়ারি ব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থায় --
- কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি মহল তৈরি করা হয়।
- গ্রামের মোড়ল বা প্রধান রাজস্ব আদায় করে সরকারকে জমা দিতে।
- কুড়ি বা ৩০ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত দেয়া হতো।
- আদায় করা রাজস্বের 40% সরকার এবং কুড়ি শতাংশ ইজারাদাররা পেত।
- এখানে কোন মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না।

